আজ সোমবার| ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১| ৫ আশ্বিন, ১৪২৮

গ্রুপ কমান্ডার হয়েও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি শরীয়তপুরের রফিকুল ইসলাম

শুক্রবার, ০২ এপ্রিল ২০২১ | ৩:৩৬ অপরাহ্ণ | 2288 বার

গ্রুপ কমান্ডার হয়েও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি শরীয়তপুরের রফিকুল ইসলাম
রফিকুল ইসলামের ছবি

রফিকুল ইসলাম যখন কথা বলছিলেন, তখন তারা চোখ দিয়ে বার বার পানি ঝড়ছিলো। আক্ষেপ করে বার বার বলছিলেন ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাদের কথা। চোখের পানিতে ভিজেছিল তার অর্জিত সনদ গুলোও। স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে লেখা বিভিন্ন বইয়ে বার বার দেখাচ্ছিলেন তার নামটি। জীবন বাঁজি রেখে পাকিস্তানী হানাদারদের হটিয়েছেন যে যুবক, আজ বয়সের ভারে নীরব নিস্তেজ। ভুগছেন শ্বাসকষ্ট সহ নানা রোগে। নিজে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকা ভুক্তির জন্য আবেদন করে ব্যর্থ হয়েছেন কয়েকবার। মনে জমিয়েছেন এক অভিমানের পাহাড়। নিরুপায় হয়ে শিক্ষকতা করেই কাঁটিয়ে দিয়েছেন জীবন। তবুও মেলেনি মুক্তিযোদ্ধার সম্মান।

শরীয়তপুরের সখিপুর থানার আরশিনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা মৃত আব্দুল কাদির হাওলাদারের ছেলে বীরমুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম (৬৮) স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহনের প্রমান হিসেবে আছে সনদও। ২নং সেক্টরের ডামুড্যা-গোসাইরহাট এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন গ্রুপ কমান্ডার হিসেবে। রয়েছিলেন অর্থ ও প্রশাসনের দায়িত্বে। শরীয়তপুরের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে রচিত বিভিন্ন বইয়ের পাতায় পাতায় লিপিবদ্ধ রয়েছে তার নাম।

বীরমুক্তযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে কুমিল্লা সার্ভে কলেজে ভর্তি অবস্থায় দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। পরিবারের লোকজন বাঁধা দিবে এমন চিন্তা থেকে কাউকে না বলেই বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। এ সময় শুধু আমার স্ত্রীকে বলেছিলাম। বাড়ি থেকে বের হয়ে কার্তিকপুরে মিতালী ভাইয়ের কাছে নাম লিখানোর পর আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় নোয়াখালী। সেখান থেকে ভারতের মেলাগড় হয় নেয়া হয় হাতিমারা ক্যাম্পে। সেখান থেকে অস্ত্র দিয়ে আমাদেরকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। ডামুড্যা-গোসাইরহাটে দায়িত্ব প্রাপ্ত কমান্ডার বাচ্চু ছৈয়ালের অধীনে আমি যুদ্ধে অংশ নেই। সেখানে আমাকে একটি প্লটুনে কমান্ডারের দায়িত্ব দেয়া হয়। এ সময় আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন পরিচালনা করি। অনেক পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের হত্যা করি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা যখন অস্ত্র জমা দেই তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় থেকে আমাদের সনদ দেয়া হয়।

চোখের জল মুছতে মুছতে অবহেলিত এ মুক্তিযোদ্ধা বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সনদ এখন উইপোকায় খেয়ে ফলেছে। কিন্তু এখনো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাইনি, সম্মান পাইনি। নিজের পরিবার পরিজন রেখে জীবন বাজি রেখে যে সংগ্রাম করলাম তার বিনিময়ে এখন অবহেলা পাচ্ছি। আমার পরিবারে খবর কেউ রাখে না। বুকটা ফেঁটে যায়, যখন দেখি আমার সহযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। আমার হয়তো সে সৌভাগ্যও হবে না।

ডামুড্যা এলাকার যুদ্ধকালীন কমান্ডার বীর মুক্তযোদ্ধা বাচ্চু ছৈয়ালও বললেন, রফিকুল ইসলামের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহনের ইতিহাস। তিনি বলেন, ” রফিকুল ইসলাম ভারতে ট্রেনিং প্রাপ্ত একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আমার এখানে প্লটুন কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া আমার এখানে অস্ত্র ও গোলাবারুদের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। কত ভূয়া মুক্তযোদ্ধা রয়েছে এদেশে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আজও তার নাম তালিকাভূক্ত হয়নি। রফিকুল ইসলাম সরল প্রকৃতির চরাঞ্চলের লোক। আমি যথা তার জন্য চেষ্টা করেছি কিন্তু পারি নাই। আমি একজন যুদ্ধকালীন কমান্ডার হিসেবে চাই, তার মত সাহসী মুক্তিযোদ্ধা যেন অতিশীঘ্রই তালিকাভুক্ত হয়”।

রফিকুল ইসলামের ছেলে স্বপন হাওলাদার বলেন, আমার বাবা অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের মত জীবন বাজি রেখে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীসহ সকলের কাছে আমাদের দাবি, অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা যে সম্মান পায় আমার বাবাকেও যেন ঐ সম্মানটুকু দেয়া হয়।

এ বিষয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব তানভীর আল নাসীফ বলেন, যদি ঐ ব্যাক্তি আমাদের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করে। তাহলে যাচাই-বাছাই কমিটির তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।


সর্বশেষ  
জনপ্রিয়  
ফেইসবুক পাতা
error: কপি করা নিষেধ !!