আজ শুক্রবার| ২০ মে, ২০২২| ৬ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯

ভূ-মধ্য সাগরে তলিয়ে যাচ্ছে অনেক পরিবারের স্বপ্ন || শরীয়তপুরে সক্রিয় মানব পাচার চক্র!

মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১ | ১:০১ অপরাহ্ণ | 706 বার

ভূ-মধ্য সাগরে তলিয়ে যাচ্ছে অনেক পরিবারের স্বপ্ন || শরীয়তপুরে সক্রিয় মানব পাচার চক্র!
ফাইল ছবি

শরীয়তপুরে আর্ন্তজাতিক মানব পাচার চক্রের সদস্যরা এখনও সক্রিয় রয়েছে। থেমে নেই তাদের অবৈধ কার্যক্রম। বিশেষ করে লিবিয়া,তুরস্ক, গ্রীস,ইতালী, স্প্যান, পাঠানোর কথা বলে পাচার কারী চক্র সাধারন মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা । ফলে ভু-মধ্য সাগরে তলিয়ে যাচ্ছে অনেকের স্বপ্ন বলে জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ মাহবুবুর রহমার জানিয়েছেন। এখনো শোকের মাতম চলছে নিখোজ পরিবারগুলোর মধ্যে। নিখোঁজ অনেকের পরিবার মামলা করেও পায়নি সু-বিচার।

Advertisements

তবে অতিরিক্ত সুপার (নড়িয়া সার্কেল) বলছেন, নড়িয়া, জাজিরা ও শরীয়তপুর সদরে মানব পাচারের অনেক মামলা রয়েছে। অনেকে আমাদের কাছে মামলা করতে আসে না। আমরা পাচার কারী চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করে কোর্টে প্রেরন করছি।

Advertisements

নড়িয়া, জাজিরা থানা ও নিখোঁজ মিঠু চৌধুরীর বাবা জিতেন চৌধুরী ও বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে, আর্ন্তজাতিক মানব পাচার চক্রের সদস্যরা শরীয়তপুরের ৬ টি উপজেলায় সক্রীয় থাকলেও বিষেশ করে নড়িয়া, জাজিরা ও শরীয়তপুর সদর উপজেলায় প্রায় অর্ধ শতাধিক সদস্য সক্রিয় রয়েছে। বিশেষ করে লিবিয়া, তুরস্ক, গ্রীস, ইতালী, স্প্যান, পাঠানোর কথা বলে পাচার কারী চক্র সাধারন মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। প্রথমে নির্দিষ্ট অংকের টাকা নিয়ে মানব পাচার কারী চক্রের সদস্যরা উন্নত ভবিষ্যতের মিথ্যা প্রলোবন দেখিয়ে ইউরোপ গমন ইচ্ছুকদের বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া পাঠায়। এরপর সেখান থেকে ঝুকিপুর্ন নৌকায় করে ইউরোপের দেশ ইতালী পাঠায়। এ সময়ে ঘটে অনেক ভয়ংকর ঘটনা।

Advertisements

শরীয়তপুর থেকে বিদেশ যেতে ইচ্ছুকদের মাফিয়া চক্রের মাধ্যমে পাশবিক নির্যাতন করে তার ভিডিও পাঠিয়ে দিয়ে স্বজনদের কাছ থেকে আদায় করে নিচ্ছে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা। টাকা দিতে না পারলে অনেক কে জীবন দিতে হয় মাফিয়া চক্রের হাতেই। পাশাপাশি লিবিয়া থেকে ভূ-মধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালী যাওয়ার সময় অবৈধ ঝুকিপূর্ন নৌকা ডুবিতে অনেকের সলিল সমাধি হচ্ছে সাগরেই। আবার অনেকেই লিবিয়া, তিউনিসিয়া সহ একাধিক দেশের কোষ্ট গার্ডের হাতে ধরা পরে দীর্ঘদিন জেল খেটে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে আসছে।

Advertisements

মানব পাচার কারী চক্রের সদস্যরা অবৈধ ভাবে মালেশিয়া, সিঙ্গাপুর, হাঙ্গেরী সহ বিভিন্ন দেশেও লোক পাঠাচ্ছে। ভূ-মধ্য সাগরে, আফ্রিকার তিউনিশিয়ার উপকুলে নৌকা ডুবিতে অনেক অভিবাসন প্রত্যাশির মৃত্যু হয়েছে। আবার অনেকে নিখোঁঝ রয়েছে। তাদের বেশির ভাগই নড়িয়া, জাজিরা ও শরীয়তপুর সদও উপজেলার হত দরিদ্র পরিবারের সন্তান।

Advertisements

তার মধ্যে গত কোরবানীর ঈদের দিন লিবিয়া থেকে ইতালী যাওয়ার পথে ঝুঁকিপূর্ন তিনটি অবৈধ নৌকা ডুবে যায়। সেখান থেকে তানজিনিয়ান কোষ্ট গার্ডের সদস্যরা ৩১৮ জনকে উদ্ধার করেছে, এরমধ্যে ১৮ জনের লাশ উদ্ধার করেছে। সেখানে নড়িয়া উপজেলার বিঝারী ইউনিয়নের নওগাঁও গ্রামের সেলিম কাজীর ছেলে কাজী ফিরোজ মাহমুদ (৩০) নিখোজ রয়েছে।

Advertisements

নিখোজ কাজী ফিরোজ মাহমুদ এর সাথে থাকা এস ডি সুমন জানায় যে, সে ভূ-মধ্য সাগরে নৌকা ডুবির সময় হিড স্টোকে কাজী ফিরোজ মাহমুদ মারা গেছে। একই ঘটনায় নিখোঁজ একই উপজেলার ফতেজঙ্গপুর ইউনিয়নের সিলংকর গ্রামের কৃষক লাল মিয়া ছৈয়ালের পুত্র নুরে আলম ছৈয়াল(১৯) । তাকে মানব পাচারকারী চক্রে সদস্য নড়িয়া পৌরসভার লোংসিং গ্রামের লিভিয়া প্রবাসী সুজন ছৈয়াল গত ৩ মাস পূর্বে লিবিয়া নেয়। সেখান থেকে আরেক মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য নড়িয়া বাংলা বাজার এলাকার জাকির ব্যাপারীর ছেলে লিভিয়া প্রবাসী ফয়সাল বেপারী সাড়ে ৮ লাখ টাকা নিয়ে গত ১৭ জুলাই ইটালী পাঠানোর কথা বলে ভূ-মধ্য সাগরে অবৈধ নৌকায় তুলে দেয়। সে ১৯ জুলাই ভুমধ্য সাগরে নৌকা ডুবিতে নিখোজঁ হয় বলে জানান তার মামা কালাই চৌকিদার। এছাড়া তার সাথে থাকা একই উপজেলা চামটা এলাকার শহীদ মোল্ল্যা(২০) নিখোজ। তাদের পরিবারের মধ্যে চলছে শোকের মাতম।

Advertisements

গত ২০১৯ সালের ঈদুল আযহার সময় ও শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মিঠু চৌধুরী , সোহেল বেপারী, জহির উদ্দিন, কবীর মিয়া, জামাল উদ্দিন সহ ১২ জন যুবক নিখোঁজ হয়। কয়েক জনের লাশ মিললে ও বাকীদের আজ ও কোন খোজ মিলেনি। ২০১৯ সালের সেপ্টেস্বর মাসে নড়িয়া উপজেলার বিঝারী ইউনিয়নের কানাদা পাড়া গ্রামের জিতেন চৌধুরীর ছেলে মিঠু চৌধুরী ইতালী যাওয়ার উদ্দেশ্যে দালাল চক্রের মাধ্যমে লিবিয়া থেকে অবৈধ ঝুকিপুর্ন নৌকায় পাড়ি জমায় সে থেকে সে নিখোঁজ হয়। পরে দালাল চক্র একাধিক বার টাকা নিলে ও আজও তার খোঁজ মিলেনি।

Advertisements

এ ব্যাপরে নিখোঁজের বাবা জিতেন চৌধুরী বাদী হয়ে নড়িয়া থানায় মানব পাচার কারী চক্রের সদস্য রতন খান সহ ৪জনকে আসামী করে একটি মালা দায়ের করে। পুলিশ আসামীকে গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরন করে। পরে সে জামিনে বেরিয়ে আসে।

Advertisements

নিখোঁজ মিঠু চৌধুরীর মা পাবতী রানী চৌধুরী, নূরে আলম ছৈয়ালের মা শাহিদা বেগম ও বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়, শরীয়তপুর জেলায় সক্রিয় মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যেও নাম -ঠিকানা পাওয়া গেছে, নড়িয়া উপজেলার গুলমাইজ এলাকার পবন খার ছেলে রতন খা, ডিঙ্গামানিক ইউনিয়নের চান ভবনী এলাকার আইয়ুব আলী ফকিরের ছেলে জিনান ফকির, নড়িয়া উপজেলার বাংলাবাজার এলাকার লিভিয়া প্রবাসী জাকির বেপারীর ছেলে ফয়সাল বেপারী, নড়িয়া পৌরসভার লোংসিং এলাকার লিভিয়া প্রবাসী সুজন ছৈয়াল, ভেদরগঞ্জ উপজেলার রামভদ্রপুর ইউনিয়নের সত্যপুর এলাকার আর্ন্তজাতিক মানব পাচার কারী চক্রের অন্যতম সদস্য বাবলু হাওলাদার। সখিপুর এলাকার মমিন আলী মোল্ল্যা বাজার এলাকার লতিফ খা, ছয়গাঁও এলাকার কবীর সরদার, পাভেজ লস্করসহ অর্ধশতাধিক মানব পাচারকারী সদস্য পুরো জেলায় সক্রিয় রয়েছে।

Advertisements

মানব পাচার এর বিয়য়টি অস্বীকার করে ডিঙ্গামানিক ইউনিয়নের চান ভবনী এলাকার মানব পাচারকারীর সদস্য আইয়ুব আলী ফকিরের ছেলে জিনান ফকির বলেন, এর সঙ্গে আমি জড়িত না।

Advertisements

মানব পাচারকারীর সদস্য নড়িয়া উপজেলার চামটা ইউনিয়নের গুলমাইজ এলাকার পবন খার ছেলে রতন খা বলেন, আমি সখিপুরের মমীন আলী মোল্ল্যার বাজার এলাকার খান বাড়ীর মানব পাচার কারীর চত্রের সদস্য লতিফ খান নিকট টাকা দিয়েছি। এর বেশী আমি কিছু জানি না। এ বিষয়ে পরে নিখোঁজ মিঠুর বাবা জিতেন চৌধুরী আমাদের নামে নড়িয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় আমি জেলও খেটেছি।
ভেদরগঞ্জ উপজেলার রামভদ্রপুর ইউনিয়নের সত্যপুর এলাকার আর্ন্তজাতিক মানব পাচার কারী চক্রের অন্যতম সদস্য বাবলু হাওলাদার বলেন, এক সময়ে লোক নিতাম, তারা ভালো ভাবেই গেছে। গত তিন চার মাস ধরে আমি কোন লোক নেই না। কত টাকা করে মানব পাচার করেন! এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যান।

Advertisements

নড়িয়া উপজেলার বিঝারী ইউনিয়নের নওগাঁও এলাকার নিখোঁজ কাজী ফিরোজ মাহমুদের মা সখিনা বেগম ও নিখোজ নুরে আলম ছৈয়ালের মা শাহিদা বেগম বলেন, মানব পাচার কারী চক্রের সদস্য ফয়সাল বেপারী ও সুজন ছৈয়াল আদম ব্যবসায়ীরা আমাদেও সন্তানদেরকে উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে অবৈধ পথে ইতালী, গ্রীস নেয়ার কথা বলে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন ভাবে লিবিয়া নিয়ে যায়। সেখান থেকে মারধর করে প্লাষ্টিকের নৌকায় উঠিয়ে সগর পাড়ি দেয়। এতে আমাদের মতো অনেক মায়ের বুক খালী হয়েছে। এখন যারা জিবিত আছে তাদের দ্রুত উদ্ধার ও যারা মারা গেছে সে সকল সন্তারদের লাশ এনে দেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবী জানাচ্ছি।

Advertisements

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নড়িয়া সার্কেল) এস এম মিজানুর রহমান বলেন, শরীয়তপুর জেলার অনেকেই ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকে সে কারনে এ এলাকার লোকজন অনেকেই বিদেশ মুখী। এ সুযোগে মানব পাচারকারী সদস্যরা প্রলোভন দেখিয়ে অনেককে ভুল পথে নিয়ে যায়। যারা ভূ-মধ্য সাগরসহ বিভিন্ন জায়গায় বিপদ গ্রস্থ হন। এ সকল বিষয়ে অনেক মামলা রয়েছে। মামলা হওয়ার কারনে অনেকেই এলাকায় থাকে না। মানব পাচারকারী এলাকায় আসলে আমাকে খবর দিবেন। আমরা আইনগন ব্যবস্থা নেবো।

Advertisements

জানতে চাইলে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মোঃ পারভেজ হাসান বলেন, আমি এ বিষয়ে এখনো কিছু জানি না। যে ৩টি পরিবারের সদস্যরা নিখোজঁ রয়েছেন। তাদেরকে অভিযোগ করতে বলেন। আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবো।

Advertisements
Advertisements

সর্বশেষ  
জনপ্রিয়  
ফেইসবুক পাতা
error: কপি করা নিষেধ !!